পাক ছক বানচাল করতে ভারতের মাটিতেই বোমা ফেললেন ইন্দিরা

আইজল: আকাশে সেনা বিমান৷ নিচে হতচকিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গর্তে ঢুকতে ব্যস্ত৷ সশস্ত্র মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রুখতে সেনাবাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা৷ বোমা পড়েছিল সুন্দরী আইজল শহরের উপরে৷ বিতর্কিত ঘটনার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হচ্ছে৷ ভারতের মাটিতে পাকিস্তানি মদতপুষ্ট নাশকতা রুখে দিতে কঠোর হয়েছিলেন প্রিয়দর্শিনী৷ ১৯৬৬ সালের কথা৷

আরও পরে রাষ্ট্র সুরক্ষায় তাঁরই নির্দেশে আশির দশকে স্বর্ণ মন্দিরে হয়েছিল সেনা অভিযান৷ গুঁড়িয়ে গিয়েছিল খালসা জঙ্গি ঘাঁটি৷ পরে জীবন দিয়ে চরম মূল্য চুকিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী৷

মিজো পাহাড়ে অস্থিরতা:
ষাটের দশক৷ সদ্য ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়েছে৷ পাঞ্জাব-রাজস্থান-গুজরাট লাগোয়া সীমান্ত এলাকায় হয়েছে প্রবল ট্যাংক সংঘর্ষ৷ দু’পক্ষের ক্ষতি হলেও সেই যুদ্ধে ভারতের বিজয় ইতিহাস৷ স্বভাবতই ক্ষুব্ধ পাকিস্তান (তখনও অখণ্ড) ধরে নিল অন্য পথ৷ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেনা কর্তাদের কাছে নির্দেশ এসেছিল করাচি থেকে (তখনকার পাক রাজধানী)৷ ঢাকায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হল৷ আর পরিকল্পনা মাফিক উত্তর পূর্বের মিজো পাহাড়ের দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে পুঁজি করে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদে মদত করতে এগিয়ে এল পাকিস্তান৷ শুরু হল প্রায় অরক্ষিত সীমান্ত টপকে মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পূর্ব পাকিস্তানে ঢোকা ও সশস্ত্র আন্দোলনের ছক তৈরি৷ অস্ত্র দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় পাক সেনা৷

পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছিল৷ সশস্ত্র সংগঠন মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ) নেতৃত্ব আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছিলেন৷ শুরু হয়েছিল নাশকতার পর্ব৷ এদিকে সরকারও কড়া ভূমিকা নেয়৷ অসম রাইফেলস অভিযান চালাতে শুরু করে মিজো পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায়৷ বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ক্রমে বড় আকার নিতে শুরু করে৷ মিজো সশস্ত্র আন্দোলনের নেতা পু লালডেঙ্গার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সেনা অফিসারদের বৈঠকের পর থেকে হামলার বহর বাড়তে থাকে মিজো জাতি অধ্যুষিত এলাকায়৷ প্রাথমিকভাবে লালডেঙ্গা সহ কয়েকজন মিজো নেতৃত্বকে গ্রেফতার করা হতেই বিক্ষোভের রেশ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে৷ অশান্তির মূল কেন্দ্র আইজল৷

অভিযানের মুহূর্তগুলি:

১৯৬৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ দিনটি গুরুত্বপূর্ণ৷ এই সময়েই মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এমএনএফ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সশস্ত্র পথে হামলার৷ ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক মিজো এলাকা তৈরির দাবিতে শুরু হয় নাশকতার পরবর্তী পর্ব৷ পাল্টা আক্রমণের জন্য তৈরি হয় কেন্দ্র৷ সতর্কতা জারি হয় অসমে৷ আইজলের একের পর এক সরকারি ভবনের দখল নিতে শুরু করে এমএনএফ৷ শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তৎকালীন অসমের মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা৷

৪ মার্চ পাল্টা হামলায় যায় ভারত সরকার৷ মিজো বিদ্রোহীদের দমন করতে শুরু হয় আইজলে বোমাবর্ষণ৷ বিমান বাহিনীর পাশাপাশি একইসঙ্গে স্থলসেনা অভিযান শুরু হয়৷ দু পক্ষের গুলি বিনিময়ে রক্তাক্ত হয় মিজো পাহাড়৷ হতাহতের সংখ্যা বাড়ছিল৷ আইজল তখন ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন৷ একসময় ভেঙে পড়ে এমএএফ৷ পরবর্তী অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি৷ উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র৷ এই সব অস্ত্রের বেশিরভাগই আনা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে৷ বিচ্ছিন্নতাবাদী মিজো নেতৃত্ব পালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘাঁটি তৈরি করে৷

পরিস্থিতি আপাত শান্ত হলেও মিজোরামকে যে অসমের মধ্যে রাখা বিপজ্জনক তা বুঝতে পারে কংগ্রেস সরকার৷ শুরু হয় অসম কেটে মিজো এলাকা তৈরির কাজ৷ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে শান্তি চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়৷ আশির দশকে এসে মিজোরাম তৈরি হয়৷ অস্ত্র ছেড়ে মূল স্রোতের রাজনীতিতে ফিরে আসে এমএনএফ ও তাদের নেতৃত্ব৷

সেদিন সেনা অভিযানের ঝুঁকি নিয়েছিলেন ইন্দিরা৷ তাঁর হুকুমে বোমা ফেলা হয়েছিল আইজল ও সংলগ্ন এলাকায়৷ বিতর্কিত এই সিদ্ধান্ত মিজোরাম তৈরির ইতিহাসে জড়িয়ে৷

——- —-

৫০০ বছর ধরে শিব মন্দির রক্ষনাবেক্ষণ করছে মুসলিম পরিবার

গুয়াহাটি: বট গাছের নীচে শতাব্দী প্রাচীন শিব মন্দির। আদতে ঠিক মন্দির নয়, একটা শিব লিঙ্গ এবং সেটার আশেপাশে রাখা কয়েকটা ত্রিশূল। যেখানে উপাসনা করেন হিন্দু এবং মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

আরও পড়ুন- কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের পাশে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব

আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ৫০০ বছরের পুরনো এই মন্দিরের দেখাশোনা করছে একটি মুসলিম পরিবার। বংশ পরম্পরায় ওই পরিবারই শিব লিঙ্গ এবং সেই সংলগ্ন এলাকার রক্ষনাবেক্ষণ করে আসছে। নিত্যদিন পুজো এবং সারা বছরের সব নিয়ম মেনে উপাসনা করা হয় মহাদেবের।

আরও পড়ুন- কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের পাশে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব

এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিটাই উত্তর পূর্বের রাজ্য অসমের রংমহল গ্রামের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে ওই মন্দিরের দায়িত্ব সামাল দিচ্ছেন বৃদ্ধ মাতিবর রহমান। মাতৃকূল থেকে তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমার মাতামহকে দেখেছি এই মন্দিরের যত্ন করতে, ওনাকে আমি নানা বলে ডাকতাম। তাঁর সেই নিষ্ঠার ধারা আমিও বজায় রেখেছি।” একই সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, “৫০০ বছর ধরে আমাদের পরিবার এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষন করছে। এখানে হিন্দু এবং মুসলিম সব ধর্মের মানুষেরাই আসেন। সবাই উপাসনা করেন।”

ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু এবং মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষের উপাসনার পদ্ধতি আলাদা। এই বিষয়ে মাতিবর রহমান বলেছেন, “নিয়ম মেনে মহাদেবের উপাসনার সবই করা হয়। হিন্দুরা যখন পুজো করে তখন মুসলিমরা দোয়া করে।” এই উপায়েই সম্প্রীতি রেখে চলেছে অসমের রংমহল।

——- —-